একটি ফরেনসিক রিপোর্টেই বাজিমাত! ৪৫ বছর পর ধরা পড়লেন জিয়ার ঘাতক মোজাফফর
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 19 Jul, 2026
দীর্ঘ সাড়ে চার দশক পর ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এলেন এক পলাতক ঘাতক। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কুশীলব মেজর মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন (অব.) অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
একটি মাত্র সূত্র, উন্নত প্রযুক্তির সহায়তা এবং ধামাচাপা পড়ে থাকা কিছু ঐতিহাসিক নথিপত্রের ভিত্তিতে দীর্ঘ ৪৫ বছরের আত্মগোপনের অবসান ঘটলো এই পলাতক আসামির। দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের এই অমীমাংসিত অধ্যায়ে কীভাবে নতুন মোড় এলো, তা যেন হার মানায় যেকোনো রোমাঞ্চকর গোয়েন্দা গল্পকেও।
ঘটনার ৪৫ বছর পর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় আসে মেজর মোজাফফরের এই আকস্মিক গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে। এত দীর্ঘ সময় লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের নেপথ্যে ছিল চাঞ্চল্যকর এক গোয়েন্দা অভিযান।
সম্প্রতি জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় গ্রেপ্তার হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারীরা তার মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ করে যোগাযোগের কিছু সন্দেহজনক সূত্র পান।এই কললিস্টের সূত্র ধরেই প্রথম মেজর মোজাফফরকে শনাক্ত করা হয়।
পরবর্তীতে একটি মোবাইল অপারেটরে কর্মরত মোজাফফরের এক স্বজনের সূত্র ধরে তার বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করেন গোয়েন্দারা।
গত ১৫ জুলাই, বুধবার মধ্যরাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকায় মোজাফফরের শ্বশুরের বাড়িতে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ৪৫ বছরে চেহারায় অনেক পরিবর্তন এলেও, মুখের অবয়ব এবং বিশেষভাবে নাকের নিচে থাকা জন্মগত একটি তিল দেখে চূড়ান্তভাবে তাকে শনাক্ত করা হয়।
ইতিহাসের সেই কালরাতের ভয়াবহ চিত্র আজও শিউরে ওঠার মতো।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ ও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের দিন দিবাগত রাত্র সাড়ে ৩টার সামান্য কিছু পরে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে ঘাতকদল কালুরঘাট থেকে গাড়িবহর নিয়ে আস্তে আস্তে সার্কিট হাউজের দিকে এগোতে থাকে। ঘাতকদলের নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান।
প্রথম দলটিকে পেছন থেকে সহায়তা করার দায়িত্বে থাকা দ্বিতীয় দলে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতির সাথেই ছিলেন মেজর মোজাফফর। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কক্ষ থেকে বের হতেই ঘাতক দলের নির্মমতার শিকার হন। জিয়াউর রহমান মুখ-থুবড়ে পড়ে যাওয়ার পর মতি তার এসএমজির ট্রিগার টিপে রেখে ম্যাগজিন খালি করে দেন। হত্যাকাণ্ডের সময় রাষ্ট্রপতির খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মেজর মোজাফফর এবং তিনিই চট্টগ্রাম সেনানিবাসের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোন করে জিয়াকে হত্যার খবরটি দেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যার পর পরই সামরিক আদালতে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়, যেখানে ১৩ জনকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হয়। তবে এই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মেজর মোজাফফর সে সময় পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
সামরিক আদালতে বিচার হলেও এই ঘটনায় পুলিশের খাতায় একটি নিয়মিত ফৌজদারী মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সেই মামলার ঐতিহাসিক নথিপত্র (প্রাথমিক তথ্য বিবরণী বা FIR) বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে হাতের লেখায় মামলার তারিখ হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে "1.6.81" (১ জুন ১৯৮১)। আর ঘটনাস্থল (P.O) হিসেবে লেখা রয়েছে "Circuit House, Chittagong"।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই মামলার আসামিদের যে তালিকা নথিতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, তার ৬ নম্বর স্থানে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা রয়েছে "6) Maj. Muzaffar" (মেজর মোজাফফর)।
কিন্তু পুলিশ স্বাধীনভাবে এই মামলার তদন্ত করতে পারেনি, যার প্রমাণ মেলে ২০০১ সালের ৩ অক্টোবর মুখ্য মহানগর হাকিম, চট্টগ্রাম-কে দেওয়া পুলিশের একটি দাপ্তরিক চিঠিতে। চিঠির বিষয়ে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল, "বিষয়ঃ-কোতোয়ালী (সিএমপি) থানার মামলা নং ১(৬)৮১ সংক্রান্তে ব্যাখা প্রদান প্রসঙ্গে।"
পুলিশের তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তা এই চিঠির নিচের অংশে থাকা একটি ইংরেজি নির্দেশনায় পরিষ্কার হয়ে ওঠে। সেখানে লেখা ছিল: "The undersigned is directed to say that the matter was discussed in the I.C.C. meeting held on 16-6-81. It has been decided that if Army authorities intimate that they have taken up the investigation of the case the Police need not proceed with it any further." (অর্থাৎ, ১৬-৬-৮১ তারিখের আইসিসি মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, সেনাবাহিনী যদি মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে, তবে পুলিশকে আর এ নিয়ে অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজন নেই)।
এই নির্দেশনার পর তদন্তভার সিআইডির কাছে ন্যস্ত হলেও, তারা আদালতের কাছ থেকে ১৭৩ বার সময় নেয়। অবশেষে ২০০১ সালের ২৪ অক্টোবর সিআইডি সাক্ষী ও প্রমাণের অভাব দেখিয়ে আদালতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে, যার মাধ্যমে বেসামরিক আদালতে বিচার প্রক্রিয়ার অঘোষিত সমাপ্তি ঘটে।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে মোজাফফরের আত্মগোপনের জীবনও ছিল বেশ নাটকীয়।
ডিবি কর্মকর্তাদের মতে, এই দীর্ঘ আত্মগোপন জীবনের একটি বড় সময় মোজাফফর পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কাটিয়েছেন। সেখানে অবস্থানের জন্য তিনি নাম পাল্টে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেছিলেন।
পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তন হলে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং গোপনে বসবাস করতে থাকেন। অবশেষে ৪৫ বছরের লুকোচুরি শেষে আইনের জালে ধরা পড়লেন জিয়া হত্যার এই অন্যতম কুশীলব।
গ্রেপ্তারের পর প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে কোর্ট মার্শাল সম্পন্ন করার জন্য তাকে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

